Quitting-EU-could-be-heaven-or-hell-for-UK-food-industry

২৮ দেশের সমন্বয়ে গঠিত অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক জোট ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) ব্রিটেনের ভবিষ্যত কী হবে- এ সিদ্ধান্ত নিতে আগামী ২৩ জুন গণভোটে অংশ নেবে ব্রিটেনের জনগণ।অবশ্য চলতি সপ্তাহে ইউরোপে থাকার ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন ব্রিটিশ পার্লামেন্টে তার জোরালো বক্তব্য তুলে ধরেছেন। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী মনে করেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের জোট থেকে ব্রিটেন বের হয়ে গেলে নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়তে পারে।বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে রাশিয়ার ক্রিমিয়া দখল ও আইএস নিধনে পুতিনের আগ্রাসী ভূমিকা ব্রিটেনকে ভাবিয়ে তুলেছে।আইএস বিরোধী জোটের কথা উল্লেখ করে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলায় ইউরো জোনে থাকলে ব্রিটেন আরও বেশি শক্তিশালী থাকবে। ব্রিটেন চাইলেই এখনও যেকোনও সন্ত্রাসীর তথ্য আদান-প্রদানে ইউরোপের দেশগুলোর বর্ডার সিকিউরিটির সহায়তা নিতে পারছে, কিন্তু ইউরোপ থেকে বের হয়ে গেলে সন্ত্রাসীদের তথ্য আদান-প্রদানের এই সুযোগটি ইউকে‘র থাকবে না। তবে ডেভিড ক্যামেরন অবশ্য স্বীকার করেছেন, তার দেশে ইউরোপের দেশগুলো থেকে ইমিগ্র্যান্ট কমিউনিটির আগ্রহ বাড়ছে বেনিফিট গ্রহনের লোভে। ব্রিটিশ জনগণের ওয়েলফেয়ার সিস্টেমে যেন ইউরোপীয় নাগরিকরা ভাগ বসাতে না পারে, সেজন্য তিনি ইউরো জোনের ভেতরে থেকেই কিছু সংস্কার প্রস্তাবের উদ্যোগ নিয়েছেন।নতুন এই সংস্কার প্রস্তাব মেনে নিলে ইউরোপীয় নাগরিকরা ব্রিটেনে আসলেও চার বছর পর্যন্ত বেনিফিট গ্রহণ করতে পারবেন না। চাইল্ড বেনিফিট হিসেবে তাদের হোম কান্ট্রির সমপরিমাণ অর্থই ব্রিটেনে আসলে পাবেন। নতুন এই সংস্কার প্রস্তাবে একদিকে যেমন বাড়তি ইমিগ্রেশনের ওপর চাপ কমবে, অন্যদিকে ব্রিটেনের সঙ্গে বাণিজ্য সুবিধা উন্মুক্ত থাকবে।

ইউরো জোন থেকে বের হলে বাংলাদেশি ব্যবসায়ী কমিউনিটি কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে জানতে চাইলে ব্রিটিশ বাংলাদেশ চেম্বার অব কর্মাসের লন্ডন রিজিওনের প্রেসিডেন্ট বশির আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ব্রিটেনের ব্যবসায়ীরা ইউরোপের প্রায় ২২৯ বিলিয়ন পাউন্ডের বাজার হারাবে। ভিসা ছাড়া সেনজেনভুক্ত দেশে অবাধ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা আসবে। ইউরোপীয় পণ্য এ দেশে আসলে ট্যাক্স বেড়ে গেলে সাধারণ ভোক্তার ওপর এর প্রভাব পড়বে। আবার অনেকেই মনে করেন, প্রচুর ইউরোপীয়দের প্রবেশের ফলে ব্রিটিশ জনগণ কাজ পাচ্ছে না। কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে প্রায় ২.৩ মিলিয়ন ইউরোপীয় ব্রিটেনে কাজ করলেও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে কাজ করছে প্রায় ২ মিলিয়ন ব্রিটিশ নাগরিক।অন্যদিকে রক্ষণাবেক্ষণ ও উন্নয়ন বরাদ্দ খাতে ইউরোপকে ব্রিটেন প্রতিদিন ৫০ মিলিয়ন অর্থ দিচ্ছে, বিনিময়ে ব্রিটেন ইউরোপ থেকে প্রায় ৮০ মিলিয়ন পাউন্ড গ্রহণ করছে। আর্থিক দিক থেকে ইউরো জোনে থাকা ব্রিটেনের জন্য লাভবান। তবে ক্লিফটন গ্রুপের সত্বাধিকারী, ব্যবসায়ী সিরাজ হক মনে করেন, অবাধে ইউরোপের নাগরিকরা ব্রিটেনে প্রবেশ করার কারণে ব্রিটেনের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস,পাবলিক ট্রান্সপোর্ট, সোশ্যাল সিকিউরিটি বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়বে। স্কুল, কলেজ ও পাবলিক ট্রান্সপোর্টে চাপ বাড়বে। কারণ, এই খাতে সরকারের বাজেট বাড়ছে না বরং অর্থনৈতিক মন্দায় এসব খাত থেকে বাজেট কর্তন করা হয়েছে।তবে ইমিগ্রেশন বিশেষজ্ঞ তাজ শাহ বলছেন, ইউরো জোন থেকে বের হয়ে গেলে ব্রিটেন আর ইউরোপীয় আইন মানতে বাধ্য না। এখন অধিকাংশ অভিবাসীরা ইউরোপীয় ইউনিয়নের মানবাধিকার আইনটির সুবিধা নিয়ে ব্রিটেনে থাকার সুযোগ পাচ্ছে, ব্রিটেন আলাদা হয়ে গেলে বাংলাদেশের মতো কমনওয়েলথভুক্ত দেশের নাগরিকরা এই আইনের সুবিধাটি গ্রহণ করতে পারবে না। তবে ইমিগ্র্যান্ট কমিউনিটির জন্য ইউরো জোনে থাকাই যৌক্তিক, কেননা ইউরোপের অনেক পরিবার এখন ইউকেতে মাইগ্রেটেড হয়ে আসছে। কারণ ইউকেতে একটা বড় বাংলাদেশি কমিউনিটি রয়েছে। ইংল্যান্ডে ইংরেজি ভাষায় উচ্চ শিক্ষার সুযোগ ভবিষ্যতে চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে সহায়ক বলে ইউরোপ থেকে ইউকেতে মাইগ্রেটেড হচ্ছেন অনেক বাংলাদেশি। কিন্তু ইউরো জোন থেকে বের হলে ইউরোপের বাঙালিরা আর চাইলেও ইউকেতে স্থায়ী হবার সুযোগ পাবেন না। ইউরো জোনে না থাকলে ইতিমধ্যে যারা ইউরোপ থেকে চলে এসেছেন ভবিষ্যতে তাদের পরিবারকে ইউকেতে আনতে বেগ পেতে হবে। এসব কিছু বিবেচনা করে তাজ সলিসিটর্সের প্রিন্সিপাল সলিসিটর তাজ শাহ ইউরো জোনের পক্ষে তার জোরালো অবস্থান তুলে ধরেন।

তবে ইইউ বিরোধী প্রচারণায় লন্ডন মেয়র বরিস জনসন ও প্রায় শতাধিক টোরি এমপির সমর্থনের কারণে গণভোট প্রশ্নে খুব শক্ত লড়াই হবে বলেই অনুমান করছে জরিপ সংস্থাগুলো। অন্যদিকে আইনজীবী নাশিদ রহমান মনে করেন, বাংলাদেশি কমিউনিটির মধ্যে ইইউ গণভোট নিয়ে লাভ-ক্ষতির হিসেব নিয়ে অনেকের ধারণা পরিষ্কার নয়,যেহেতু এ ধরনের গণভোটে কোন প্রার্থী থাকে না, রাজনৈতিক দলের কোনও প্রতিনিধিত্ব থাকে না,সরকার গঠনের কোনও ব্যাপার থাকে না, তাই গণভোটে সাধারণ ভোটারদের আগ্রহ হয়তো কম হতে পারে। কিন্তু এ ধরনের সিদ্ধান্তের ওপর যেহেতু ব্রিটেনের জনগণের এবং আগামী প্রজন্মের নাগরিকদের ভাগ্য নির্ভর করছে, তাই প্রত্যেকের উচিৎ ইইউ গণভোটের লাভ-ক্ষতির হিসেব বিবেচনা করে নিজেদের মতামত দেওয়া।

 

Originally written by – তানভীর আহমেদ